নিজস্ব প্রতিবেদক
আফ্রিকার হৃদয়ে অবস্থিত সুদান—যে দেশ এক সময় কৃষি ও সংস্কৃতির ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ছিল, আজ তা পরিণত হয়েছে বৈশ্বিক শক্তিধরদের স্বার্থের রণক্ষেত্রে। এর মূল কারণ একটাই—সোনা। আফ্রিকার অন্যতম বৃহৎ স্বর্ণসম্পদে ভরপুর এই দেশটি আজ শকুনের ঝাঁকের মতো পশ্চিমা ও মধ্যপ্রাচ্যের ধনী দেশগুলোর লোভের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
অজস্র সোনার ভাণ্ডার, কিন্তু জনগণ দরিদ্র
আনুমানিকভাবে সুদানে প্রতিবছর ৯০-১০০ টন সোনা উত্তোলিত হয়। তবে এর বড় অংশই চলে যায় বিদেশি কোম্পানি ও চোরাচালান চক্রের হাতে। সোনার পাহাড়ের ওপর দাঁড়িয়েও সুদানের সাধারণ মানুষ চরম দারিদ্র্য, ক্ষুধা ও যুদ্ধের যন্ত্রণা সহ্য করছে।
পশ্চিমা আগ্রহের পেছনে অর্থনীতি ও কৌশল
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বেশ কয়েকটি কোম্পানি দীর্ঘদিন ধরেই সুদানের সোনার খনিতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের চোখে সুদানের সোনা শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং কৌশলগত সম্পদও—কারণ আফ্রিকার এই অঞ্চলটি মধ্যপ্রাচ্য ও সাব-সাহারান আফ্রিকার মধ্যে সেতুবন্ধন তৈরি করে। তাই কে এই সম্পদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে, সেটিই আজ বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মূল প্রশ্ন।
মধ্যপ্রাচ্যের খেলোয়াড়রাও পিছিয়ে নেই
বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের ধনকুবের কোম্পানিগুলো সুদানের সোনা রপ্তানি ও পরিশোধন খাতে সরাসরি বিনিয়োগ করছে। দুবাইয়ের সোনার বাজারে প্রতিদিন যে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বেচাকেনা হয়, তার একটি বড় অংশই আসে সুদান থেকে। অভিযোগ রয়েছে, এই বাণিজ্যের মাধ্যমে যুদ্ধবাজ গোষ্ঠীগুলো অস্ত্র ও অর্থ জোগাড় করছে।
যুদ্ধের পেছনেও সোনার গন্ধ
বর্তমান সুদানের গৃহযুদ্ধ—যেখানে সেনাবাহিনী ও আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্স (RSF) মুখোমুখি—তার নেপথ্যেও সোনার খনির নিয়ন্ত্রণই মূল ইস্যু। আরব ও পশ্চিমা দেশগুলো গোপনে একপক্ষকে সমর্থন দিচ্ছে, যার বিনিময়ে তারা পাচ্ছে সোনার ভাগ। ফলে যুদ্ধের আগুন নিভছে না, বরং আরও জ্বলে উঠছে।
ধ্বংসস্তূপের নিচে লুকিয়ে থাকা আশা
যুদ্ধবিধ্বস্ত সুদানে এখন মানবিক বিপর্যয় চরমে। লাখো মানুষ শরণার্থী, শিশুরা অনাহারে, নারীরা নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। অথচ তাদের মাটির নিচে রয়েছে এমন এক সম্পদ, যা দিয়ে গোটা দেশটি সমৃদ্ধ হতে পারত। কিন্তু যতদিন লোভী পরাশক্তিগুলো এই সোনাকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে লড়াই চালাবে, ততদিন সুদানের স্বাধীনতা ও স্থিতিশীলতা অধরাই থেকে যাবে।
সুদানের সোনা যেন আশীর্বাদ নয়, অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এই সোনার লোভেই দেশটি আজ বিভক্ত, ধ্বংসস্তূপে পরিণত। ইতিহাস বলছে—যে সম্পদের জন্য মানুষ লোভে পড়ে, সেই সম্পদই একদিন তার সর্বনাশ ডেকে আনে। সুদানও যেন তারই জ্বলন্ত উদাহরণ।
