শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬ | বাংলা: ২৫ আশ্বিন ১৪৩৩ | আরবি: ২৯ রবিউস সানি ১৪৪৮

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বাংলাদেশ

২৭.৫১°C
ঘন মেঘলা Humidity: ৬২%
Wind: WNW at ১.৫৫ M/S
রবিবার
২৫.৫৮°C / ২৫.৫৮°C
সোমবার
২৬.২২°C / ২৬.২২°C
মঙ্গলবার
৩০.৪২°C / ৩০.৪২°C
বুধবার
৩১.৩৯°C / ৩১.৩৯°C
বৃহস্পতিবার
২৮.২৬°C / ২৮.২৬°C
শুক্রবার
২৮°C / ২৮°C
শনিবার
২৭.৩৩°C / ২৭.৩৩°C

বাবাকে হারিয়ে শোককে শক্তিতে পরিণত করে ইতি উপজেলা সেরা, উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কা

বাবাকে হারিয়ে শোককে শক্তিতে পরিণত করে ইতি উপজেলা সেরা, উচ্চশিক্ষা নিয়ে শঙ্কা

স্টাফ রিপোর্টার:

দারিদ্র্য আর বাবাকে হারানোর বেদনা—দুটিই ছিল তার নিত্যসঙ্গী। সংসারে অভাব থাকলেও লেখাপড়ার প্রতি ছিল অদম্য আগ্রহ। সেই অদম্য ইচ্ছা ও কঠোর অধ্যবসায়ের কাছে হার মেনেছে দারিদ্র্য। বাবার মৃত্যুর শোককে শক্তিতে পরিণত করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার নয়ালাভাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক লাভাঙ্গা গ্রামের মোসা. ইতি খাতুন। মানবিক বিভাগ থেকে পরীক্ষা দিয়ে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়েছে সে।

১২৫০ নম্বরের মধ্যে ইতি পেয়েছে ১০৫৮ নম্বর। সে রাণীহাটি এমএল উচ্চ বিদ্যালয়ের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী। তার এই সাফল্যে খুশি পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসী। তবে সাফল্যের আনন্দের আড়ালে রয়েছে উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনিশ্চয়তা। চরম অর্থকষ্টে তার উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন এখন অনেকটাই অনিশ্চিত।

ইতির মা আকতারা বেগম জানান, একদিন জ্বালানির জন্য বাগানে শুকনো গাছের ডাল কাটতে গিয়ে তার স্বামী জাফর আলী কোমরে গুরুতর আঘাত পান। এরপর প্রায় ছয় মাস তিনি বিছানায় ছিলেন। এসএসসি পরীক্ষা চলাকালীন শেষ তিনটি পরীক্ষার আগের দিন অসুস্থ অবস্থায় মারা যান তিনি। বাবার মৃত্যুর পর শোককে শক্তিতে পরিণত করে পড়াশোনা চালিয়ে যায় ইতি।

বাবা ছিলেন পরিবারের প্রধান ভরসা। তাকে হারানোর পর সংসারে নেমে আসে আরও চরম সংকট। বই-খাতা কেনা থেকে শুরু করে পড়াশোনার খরচ—সবকিছুতেই ছিল সীমাবদ্ধতা। তবুও ভালো ফল করার লক্ষ্য থেকে সরে যায়নি ইতি।

বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যাথা সেলাই ও পশু পালনসহ বিভিন্ন কাজে মাকে সহযোগিতা করছে সে। কাজের চাপে অনেক সময় নিয়মিত স্কুলে যেতে পারেনি। বিদ্যুৎ না থাকলেও কম আলোতে রাতের পর রাত পড়াশোনা করেছে। কোনো বিষয় বুঝতে সমস্যা হলে বন্ধুদের কাছ থেকে জেনে নেওয়া কিংবা শিক্ষকদের কাছ থেকে আলাদাভাবে বুঝে নিয়েছে।

ইতি জানায়, কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করে এসএসসিতে উপজেলা পর্যায়ে প্রথম হয়ে সে প্রমাণ করেছে, সুযোগ ও সহযোগিতা পেলে দারিদ্র্য কোনো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের পথে বাধা হতে পারে না। তার স্বপ্ন—ভবিষ্যতে একজন আদর্শ শিক্ষক হওয়া এবং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ানো, যাতে অর্থের অভাবে কেউ পড়াশোনা থেকে ঝরে না পড়ে।

ইতির শ্রেণিশিক্ষক মুখলেসুর রহমান বলেন, বাবার অসুস্থতার সময় অনেক দিন ইতি সময়মতো স্কুলে আসতে পারেনি। তবে পড়াশোনার প্রতি তার চেষ্টা ছিল অটুট। স্কুলের নির্বাচনী পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়ার পর তার প্রতি প্রত্যাশা আরও বেড়ে যায়। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় মানবিক বিভাগ থেকে বিদ্যালয়ের একমাত্র গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছে ইতি।

রাণীহাটি এমএল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. কামাল উদ্দিন বলেন, এবারের ফলাফলে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে আশানুরূপ ফল না হলেও তার বিদ্যালয়ে এর ব্যতিক্রম হয়েছে। বিশেষ করে ইতির ফলাফলে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, “ও খুবই মেধাবী ও পরিশ্রমী। পারিবারিক নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও সে পড়াশোনা চালিয়ে গেছে। তার এই সাফল্যে আমরা গর্বিত।”

ইতির মা আকতারা বেগমের আকুতি, সহযোগিতা পেলে তার মেয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে এবং একজন আদর্শ শিক্ষক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে পারবে।

এখন ইতির সামনে আরও বড় স্বপ্ন। মেধা, পরিশ্রম ও অদম্য ইচ্ছাশক্তির এই গল্প যেন উচ্চশিক্ষার পথে অর্থের অভাবে থেমে না যায়—এমন প্রত্যাশা পরিবার, শিক্ষক ও এলাকাবাসীর। সমাজের বিত্তবান ও শিক্ষানুরাগীদের সহযোগিতা পেলে ইতি তার স্বপ্ন পূরণ করতে পারবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Image

সত্যের সন্ধানে জনগনের সাথে

Please fill the required field.