চাঁপাইনবাবগঞ্জ প্রতিনিধি :
মাত্র ৫ মাস বয়সী রাইসা তাবাসসুম ছিল বাবা-মায়ের আদরের দ্বিতীয় সন্তান। মায়াভরা মুখ, ফুটফুটে হাসি আর ছোট ছোট চাহনিতে ভরে থাকত পুরো পরিবার। ৭ বছর বয়সী বড় বোন হুমাইরা আফিয়া স্কুলে যাওয়ার আগে ছোট বোনকে নিয়ে খেলতে ব্যস্ত থাকত। সংসারের কাজের ফাঁকে মা ফাতেমা বেগমেরও সময় কাটত রাইসাকে ঘিরেই।
কিন্তু ঈদের আনন্দের মধ্যেই নেমে আসে ভয়াবহ দুঃসংবাদ। গত ২১ মার্চ ঈদের দিনে রাইসার শরীরে হালকা জ্বর ও র্যাশ দেখা দেয়। তখন চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছিল। আতঙ্কিত বাবা-মা ঈদের সব আনন্দ বাদ দিয়ে শিশুটিকে নিয়ে ছুটে যান হাসপাতালে।
অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালে সেদিন সময়মতো ডাক্তার ও নার্স পাওয়া যায়নি। এমনকি স্যালাইন দেয়ার জন্য ক্যানোলা লাগাতেও কেউ সাহস দেখাননি। পরে রাইসার বাবা মাসুদ রানা বাইরে থেকে একজন নার্স এনে স্যালাইন ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরও বাইরের চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হয় পরিবারটিকে।
এরপরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। শ্বাসকষ্ট শুরু হলে দায়িত্বরত চিকিৎসক শিশুটিকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু শহরের একটি রেস্টুরেন্টে মাত্র ১০ হাজার টাকা বেতনে চাকরি করা মাসুদ রানার পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে সেখানে নেয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার ১২ দিন পর ধারদেনা ও বেতনের টাকা জোগাড় করে মেয়েকে নিয়ে যান রাজশাহী মেডিকেলে।
ভর্তির তিনদিন পর আইসিইউ পেলেও কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ১২ এপ্রিল সাধারণ ওয়ার্ডে স্থানান্তর করা হয় রাইসাকে। কিন্তু পরদিন থেকেই আবার অবস্থার অবনতি হয়। এরপর আর আইসিইউ মেলেনি। অবশেষে গত ২৪ এপ্রিল মৃত্যুর কাছে হার মানে ছোট্ট রাইসা।
হাসপাতালের বারান্দায় বসে বিলাপ করতে করতে রাইসার মা ফাতেমা বেগম বলেন,
“আমার বুকের ধনটিকে একটু দেখেন, ও তো আমার সাথে কথা বলছে না।”
কিছুক্ষণ পর চিকিৎসক জানিয়ে দেন—রাইসা আর নেই।
সন্তান হারানোর শোকের মধ্যেও আরেক দুঃসহ অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয় পরিবারটিকে। লাশবাহী গাড়ির সিন্ডিকেটের কারণে ১২ হাজার টাকা ভাড়া গুনে শিশুটির মরদেহ বাড়িতে আনতে হয় তাদের।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ফাতেমা বেগম বলেন,
“এখন বড় মেয়েটা স্কুলে গেলে ছোট মেয়ের ছবি দেখে সময় কাটাই। অজান্তেই কান্না চলে আসে।”
বড় বোন হুমাইরা আফিয়া জানায়,
“আমার বোন রাজশাহী থেকে আসার পর আকাশের তারা হয়ে গেছে। এখন আমার আর কোনো খেলার সাথি নেই।”
সন্ধ্যায় বাড়িতে গিয়ে কথা হলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন বাবা মাসুদ রানা। তিনি বলেন,
“হাসপাতালে বেড নেই, নার্স নেই। ছুটির দিনে কাউকে পাওয়া যায় না। যারা থাকে তারাও খারাপ ব্যবহার করে। এসব নিয়ে লিখেন। আমার সন্তান তো আর ফিরবে না। তবে চিকিৎসা ব্যবস্থা উন্নত হলে আর অ্যাম্বুলেন্স ও লাশবাহী গাড়ির সিন্ডিকেট বন্ধ হলে আমি খুশি হব।”
প্রতিবেশী ইসাহাক আলি জানান, পৈত্রিক সূত্রে পাওয়া দেড় কাঠা জমির ওপর ছোট্ট ঘরেই সংসার ছিল মাসুদ রানার। আর্থিক কষ্টের কারণে প্রথম সন্তানের আট বছর পর দ্বিতীয় সন্তান নেন তারা। অনেক স্বপ্ন নিয়ে রাইসাকে বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন বাবা-মা। কিন্তু হামের কাছে হার মানতে হয়েছে পরিবারটিকে।
উল্লেখ্য, গত তিন মাসে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর হাসপাতালে হামের উপসর্গে ৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এছাড়া রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যাওয়া শিশুদের বেশিরভাগই চাঁপাইনবাবগঞ্জের বলে জানা গেছে।
