বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬ | বাংলা: ২৩ আশ্বিন ১৪৩৩ | আরবি: ২৭ রবিউস সানি ১৪৪৮

চাঁপাইনবাবগঞ্জ, বাংলাদেশ

৩০.১৩°C
SP_WEATHER_MODERATE_RAIN Humidity: ৫৮%
Wind: SSE at ২.৩১ M/S
শুক্রবার
২৩.৩৫°C / ২৩.৩৫°C
শনিবার
২৭.৯৩°C / ২৭.৯৩°C
রবিবার
৩১.৫৩°C / ৩১.৫৩°C
সোমবার
৩০.৯৮°C / ৩০.৯৮°C
মঙ্গলবার
২৫.৯৯°C / ২৫.৯৯°C
বুধবার
২৬.৪৮°C / ২৬.৪৮°C
বৃহস্পতিবার
২৫.২৯°C / ২৫.২৯°C

ক্ষুধার্ত পেট, বাবার কিস্তির বোঝা—সেই কাজলই এখন সহকারী জজ

ক্ষুধার্ত পেট, বাবার কিস্তির বোঝা—সেই কাজলই এখন সহকারী জজ

স্টাফ রিপোর্টার 

পেটে ক্ষুধা, মাথার ওপর বাবার এনজিওর কিস্তির বোঝা। তার ওপর দিনমজুর বাবার সামান্য আয়। প্রতিদিনের এই কঠিন বাস্তবতা চোখ রাঙালেও দমে যাননি চাঁপাইনবাবগঞ্জের গোমস্তাপুর উপজেলার প্রত্যন্ত মাধাইপুর গ্রামের তুরি নৃগোষ্ঠীর সন্তান কাজল পাঁড়ে। অভাবকে সঙ্গী করেই পড়াশোনার পাশাপাশি টিউশনি করেছেন, বিভিন্ন কাজ করেছেন। কখনো কখনো ঘরে খাবার না থাকায় না খেয়েই স্কুলে যেতে হয়েছে তাকে। সেই অন্ধকার পেরিয়ে আজ তিনি ১৮তম বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (বিজেএস) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন।

কাজল পাঁড়ের এই সাফল্যে শুধু তার পরিবার নয়, আনন্দের জোয়ার বইছে পুরো মাধাইপুর গ্রামে। দীর্ঘ ২২ বছরে এ গ্রাম থেকে কোনো সরকারি চাকরিজীবী না থাকলেও কাজলই প্রথম সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে বিচারকের আসনে বসতে যাচ্ছেন। রাজশাহী থেকে গ্রামে ফিরলে গ্রামবাসী ফুলের মালা দিয়ে তাকে বরণ করে নেন।

জানা গেছে, মাধাইপুর গ্রামের ভূমিহীন কৃষক নরেশ পাঁড়ে ও পঞ্চমী জেড়ি দম্পতির একমাত্র ছেলে কাজল। অভাবের কারণে তার তিন বোনের পড়াশোনা প্রাথমিকের গণ্ডি পেরোনোর আগেই থেমে যায়। অল্প বয়সেই তাদের বিয়ে দিতে হয়। এমন পরিবারের একমাত্র ছেলে কাজলের পড়াশোনার পথও ছিল কণ্টকাকীর্ণ।

মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু করেন কাজল। পরে মিশন স্কুল, এনায়েতপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও রহনপুর ইউসুফ আলী কলেজে পড়াশোনা করেন। উচ্চশিক্ষায় ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্রথমবার ধাক্কা খেলেও দ্বিতীয়বার একসঙ্গে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পান। শেষ পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন তিনি।

২০১৭ সালে আইন বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই বিচার বিভাগে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন কাজল। সেই স্বপ্ন পূরণে প্রায় আট বছর ধরে চালিয়ে যান নিরলস চেষ্টা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় নিজের খরচ চালাতে টিউশনি করেছেন। পাশাপাশি নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন।

ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাবা নরেশ পাঁড়েকেও করতে হয়েছে কঠোর সংগ্রাম। এনজিওর কিস্তি পরিশোধ, দিনমজুরি ও গরু বিক্রির পাশাপাশি কাজের বিনিময়ে টাকা (কাবিটা) কর্মসূচিতেও শ্রমিক হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। মানুষের কাছে হাত না পেতে নিজের শ্রমের বিনিময়ে পাওয়া অর্থেই ছেলের শিক্ষার খরচ জুগিয়েছেন।

অবশেষে সেই সংগ্রামের ফল এসেছে ১৮তম বিজেএস পরীক্ষায়। ২০০ জনের মধ্যে ১৪০তম স্থান অর্জন করে সহকারী জজ হিসেবে সুপারিশ পেয়েছেন কাজল পাঁড়ে।

ফল প্রকাশের পর বুধবার সন্ধ্যায় প্রথমে বন্ধুর মাধ্যমে সাফল্যের খবর পান কাজল। পরে বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের ওয়েবসাইটে ফল দেখে নিশ্চিত হন। এরপর রাজশাহী থেকে নিজ গ্রামে ফিরলে তাকে ফুলের মালা দিয়ে বরণ করে নেন গ্রামবাসী।

কাজল পাঁড়ে বলেন, “বিচার বিভাগে যাওয়ার স্বপ্ন পূরণের এই মুহূর্তে দীর্ঘ সংগ্রামের দিনগুলোর কথা মনে পড়ছে। পরিবারের ত্যাগ, নিজের পরিশ্রম এবং নানা হতাশার মধ্যেও লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত না হওয়ার চেষ্টা—সবকিছুই আজ মনে পড়ছে।”

ছেলের সাফল্যে আবেগাপ্লুত বাবা নরেশ পাঁড়ে ও মা পঞ্চমী জেড়ি। ছেলের বিষয়ে বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মা। তিনি বলেন, “ছেলে অনেক কষ্ট করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল। আজ তার সেই স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। এর চেয়ে বড় আনন্দ আর কী হতে পারে।”

বাবা নরেশ পাঁড়ের প্রত্যাশা, ছেলে ভবিষ্যতে শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, দরিদ্র ও অসহায় মানুষের জন্যও কাজ করবেন।

গ্রামের প্রবীণ জারাধন পাঁড়ে বলেন, তাদের সম্প্রদায়ের কেউ এর আগে এমন জায়গায় পৌঁছাতে পারেননি। কাজলের সাফল্যের খবর শুনে আনন্দে কেঁদে ফেলেন তিনিও।

মাধাইপুর গ্রামের প্রধান নিরঞ্জন তিরকি বলেন, “কাজলের এই অর্জন শুধু তার পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্য গর্বের। প্রতিকূলতার মধ্যেও সে যে জায়গায় পৌঁছেছে, তা এলাকার শিশু-কিশোরদের পড়াশোনায় আগ্রহী করবে এবং বড় স্বপ্ন দেখতে সাহস জোগাবে।”

স্থানীয় পার্বতীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মোজাম্মেল হোসেনও কাজলের সাফল্যে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য না থাকলেও মেধা, অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে কাজল সহকারী জজ হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছেছেন। তার এই অর্জন এলাকার অন্য তরুণদের জন্যও অনুপ্রেরণার।

জাতীয় আদিবাসী পরিষদের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক বিভূতিভূষণ মাহাতোর দাবি, তুরি সম্প্রদায়ের মধ্যে মেধার ভিত্তিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া প্রথম ব্যক্তি কাজল। উত্তরবঙ্গের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে বিচার বিভাগে সুপারিশ পাওয়ার ক্ষেত্রেও তার অর্জন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন তিনি।

কাজলের সাফল্যে আনন্দিত তার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও এলাকাবাসীও। মাধাইপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. সাজ্জাদ আলী বলেন, “দারিদ্র্যকে হারিয়ে কাজল পাঁড়ে আজ পুরো মাধাইপুর গ্রামের গর্ব। তার সাফল্য প্রমাণ করে—অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে কোনো বাধাই বড় নয়।”

অভাব, অনটন আর প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করে কাজল পাঁড়ের সহকারী জজ হওয়ার গল্প এখন শুধু একটি পরিবারের সাফল্যের গল্প নয়; এটি প্রত্যন্ত গ্রামের অসংখ্য স্বপ্নবাজ তরুণের জন্য নতুন করে স্বপ্ন দেখার অনুপ্রেরণা।

Image

সত্যের সন্ধানে জনগনের সাথে

Please fill the required field.