নিজস্ব প্রতিবেদক, চাঁপাইনবাবগঞ্জে হামের প্রাদুর্ভাব বেড়ে যাওয়ায় জেলার ২৫০ শয্যার হাসপাতালে সৃষ্টি হয়েছে নাজুক পরিস্থিতি। নির্ধারিত শয্যার তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি রোগী ভর্তি থাকায় চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে হাসপাতালে ৬০০-এর বেশি রোগী চিকিৎসাধীন, যার মধ্যে ২৫০-এর বেশি শিশু। ভর্তি থাকা শিশুদের বড় একটি অংশ হামে আক্রান্ত।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, চলতি মার্চ মাসেই ২৪৩ জন হাম আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৬৫ জন ছেলে ও ৭৮ জন মেয়ে শিশু। ২৯ মার্চ একদিনেই ৪৬ জন রোগী ভর্তি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও চাপের মুখে পড়ে। বর্তমানে হাসপাতালে ৯৩ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে।
জেলা সদরসহ আশপাশের বিভিন্ন উপজেলা থেকে আক্রান্ত শিশুদের হাসপাতালে আনা হচ্ছে। এতে করে বেড সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীদের মেঝেতে বা বিকল্প স্থানে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার ধোবড়া গ্রামের পলিয়ারা খাতুন জানান, পরিবারের সদস্যদের জ্বরের পর তার দুই মেয়েই হামে আক্রান্ত হয়। টিকা নেওয়া থাকলেও বড় মেয়ে আক্রান্ত হয়েছে। তেলকুপি গ্রামের রুমি খাতুন বলেন, প্রথমে তার সন্তানের নিউমোনিয়া মনে হলেও পরে হামের লক্ষণ দেখা দিলে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। সুন্দরপুর ইউনিয়নের তুনজেরা খাতুন জানান, তার সন্তানের সব টিকা নেওয়া থাকলেও সে হামে আক্রান্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বেড ও ফ্যান সংকটে ভোগান্তির কথাও জানান তিনি।
চিকিৎসকরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা হাঁচি-কাশি বা সংস্পর্শের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন জটিলতা দেখা দিচ্ছে।
শিশু বিভাগের চিকিৎসক ডা. মাহফুজ রায়হান জানান, টিকা নেওয়া ও না নেওয়া—উভয় ধরনের শিশুই আক্রান্ত হচ্ছে, তবে টিকাদানের হার কম হওয়াই বড় কারণ। গুরুতর রোগীদের জন্য আইসিইউ সুবিধা না থাকায় তাদের রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হচ্ছে। তিনি আরও জানান, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে একজন করে এবং মার্চে দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। হামে আক্রান্ত হয়ে সেরে ওঠার পরও তিন মাস পর্যন্ত ঝুঁকি থাকে।
গত তিন মাসে হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে চলতি মার্চ মাসেই মারা গেছে দুইজন।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মু. মশিউর রহমান জানান, গত তিন মাসে প্রায় ৩২০ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। আউটডোরে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের সংখ্যা আরও বেশি। জায়গা সংকটের কারণে কিডনি ডায়ালাইসিস ইউনিটেও রোগীদের চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। তিনি জানান, নতুন ইউনিটে শিশুদের জন্য আলাদা বিভাগ, আইসিইউ ও সিসিইউ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
হঠাৎ সংক্রমণ বৃদ্ধির সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত করে বলা না গেলেও, শিশুদের টিকাদানে ঘাটতিকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। চিকিৎসকরা আক্রান্তদের আলাদা রাখা ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দিয়েছেন।
